ঢাকার বাস চলাচলে শৃঙ্খলা ফেরানোর নতুন উদ্যোগ, সফল হবে কি ৩২ রুটের পরিকল্পনা?

লেখক:
প্রকাশ: ১৭ ঘন্টা আগে

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানী ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরেই বিশৃঙ্খলা, যানজট ও বাসের মধ্যে প্রতিযোগিতা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। এসব সমস্যা কমাতে এবার বাস চলাচলের কাঠামো পরিবর্তনের পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ৩২টি রুটে ৩২টি নির্ধারিত কোম্পানির অধীনে বাস পরিচালনার কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, এই উদ্যোগ কার্যকর হলে সড়কে প্রতিযোগিতা কমবে এবং যাত্রীসেবার মান বাড়বে।

বাসের প্রতিযোগিতা বাড়াচ্ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি

ঢাকার সড়কে যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে অপরিকল্পিত বাস পরিচালনাকে দায়ী করেন পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। যাত্রী তুলতে গিয়ে একই রুটের বাসগুলোর মধ্যে আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতা, বিপজ্জনকভাবে ওভারটেকিং এবং যেখানে-সেখানে থামার প্রবণতা প্রায়ই দেখা যায়। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ার পাশাপাশি যান চলাচলও বাধাগ্রস্ত হয়।

অন্যদিকে, বাসের আসন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং যাত্রী ওঠানামার ব্যবস্থাপনা নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। ফলে প্রতিদিন কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা অন্যান্য গন্তব্যে যেতে নগরবাসীকে নানা দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

আগের উদ্যোগ কেন টেকেনি?

ঢাকার বাস চলাচলে সমন্বয় আনতে এর আগেও বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘ প্রস্তুতির পর ২০২১ সালে চালু হয় রুট র‍্যাশনালাইজেশন কার্যক্রম। এর অংশ হিসেবে ঢাকা নগর পরিবহন চালু করা হলেও প্রত্যাশিত সাফল্য আসেনি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্ধারিত রুটে নতুন ব্যবস্থার বাস চালু হলেও অন্যান্য পরিবহন কোম্পানির বাস চলাচল বন্ধ করা যায়নি। ফলে যাত্রী সংগ্রহের প্রতিযোগিতা আগের মতোই থেকে যায়। পাশাপাশি যানজট, নির্ধারিত সময়ে চলাচলের সীমাবদ্ধতা এবং পরিচালন ব্যয়ের কারণে চালকদের আয় নিয়েও সমস্যা তৈরি হয়।

নতুন পরিকল্পনায় কী পরিবর্তন আসবে?

এবার বাস ব্যবস্থাপনায় ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতি চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর আওতায় প্রতিটি নির্দিষ্ট রুট পরিচালনার দায়িত্ব থাকবে একটি নির্ধারিত কোম্পানির হাতে। বাসের সংখ্যা, যাত্রী ওঠানামার স্থান এবং পরিচালনব্যবস্থা পরিকল্পিতভাবে নির্ধারণ করা হবে।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ই-টিকিটিং ও জিপিএস প্রযুক্তি ব্যবহারের কথাও রয়েছে। এতে বাসের চলাচল পর্যবেক্ষণ এবং যাত্রীসেবা ব্যবস্থাপনা সহজ হতে পারে। পাশাপাশি চালক ও সহকারীদের দৈনিক ট্রিপের ওপর নির্ভরশীল আয়ের পরিবর্তে মাসিক বেতনের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) নির্বাহী পরিচালক মসিউর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, নির্ধারিত স্টপেজের বাইরে বাস থামানো বন্ধ করা গেলে চলাচলে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হবে। যাত্রীসংখ্যা ও পরিচালন ব্যয়ের হিসাব বিবেচনায় নিয়ে এমন ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা চলছে, যাতে কোম্পানিগুলো আর্থিক ক্ষতির মুখে না পড়ে।

পরীক্ষামূলক কার্যক্রম ঘিরে প্রত্যাশা

প্রাথমিকভাবে ছয়টি রুট চূড়ান্ত করার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি পাঁচটি চক্রাকার রুট চালুর বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৮ অক্টোবর থেকে চূড়ান্ত ছয়টি রুটের যেকোনো দুটিতে পরীক্ষামূলকভাবে নতুন সেবা চালুর বিষয়ে বাস মালিকদের সম্মতির কথা জানানো হয়েছে।

তবে নতুন ব্যবস্থা কার্যকর করতে শুধু রুট নির্ধারণই যথেষ্ট হবে না। নির্ধারিত কোম্পানিগুলোর মধ্যে সমন্বয়, বাসের পর্যাপ্ততা এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করাও জরুরি।

চালকদের আয়ের কাঠামো বদলানো জরুরি

বর্তমান ব্যবস্থায় অনেক চালককে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা মালিককে জমা দিয়ে বাস চালাতে হয়। জ্বালানি, বিভিন্ন পরিচালন ব্যয় এবং অন্যান্য খরচ বহনের পর তাঁদের আয় নির্ভর করে দিনের মোট যাত্রী ও ট্রিপের ওপর। এ কারণে বেশি যাত্রী তোলার তাগিদে সড়কে প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

নতুন ব্যবস্থায় চালক ও সহকারীদের মাসিক বেতন চালু করা গেলে এই চাপ কমতে পারে। তবে এর জন্য পরিবহন কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা এবং মালিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলমের বক্তব্যের সারকথা হলো, পরিবহন ব্যবসার লাভ-লোকসানের দায় মালিক ও কোম্পানিরও বহন করা উচিত। চালকদের ওপর সব আর্থিক চাপ রেখে চুক্তিভিত্তিক পদ্ধতি চালু থাকলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা কঠিন হবে।

বিনিয়োগ ও প্রণোদনার ওপর গুরুত্ব

গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান মনে করেন, পরিবহন খাতের বর্তমান মালিকদের বিনিয়োগ ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে নতুন পদ্ধতিকে টেকসই করার সম্ভাবনা বাড়বে। তবে এ জন্য মালিকদের আস্থা অর্জন এবং প্রয়োজনীয় প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁর মতে, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বিদ্যমান পরিবহন খাতের সঙ্গে সমন্বয় রেখে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় নতুন বাস পরিচালনব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখা কঠিন হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত কী হবে?

ঢাকার গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে ৩২ রুটে ৩২ কোম্পানির পরিকল্পনা নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। নির্ধারিত স্টপেজ, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং চালকদের বেতনভিত্তিক নিয়োগ বাস্তবায়িত হলে বাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতা কমতে পারে।

তবে আগের উদ্যোগগুলোর অভিজ্ঞতা বলছে, পরিকল্পনা গ্রহণের চেয়ে তার ধারাবাহিক বাস্তবায়ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাস মালিকদের সহযোগিতা, চালকদের ন্যায্য পারিশ্রমিক, কার্যকর তদারকি এবং নিয়ম ভাঙলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে তবেই এই উদ্যোগের সুফল মিলতে পারে।

এখন মূল প্রশ্ন—নতুন ব্যবস্থাটি কি ঢাকার সড়কে সত্যিই শৃঙ্খলা ফেরাতে পারবে, নাকি আগের পরিকল্পনাগুলোর মতো এটিও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জে আটকে যাবে?