পঞ্চগড়ে লাউয়ের বাম্পার ফলন, তবু লোকসানে কৃষক; ঢাকায় দাম ৬০ টাকা

লেখক:
প্রকাশ: ১ দিন আগে

পঞ্চগড়ে লাউয়ের ভালো ফলন হলেও বাজারে প্রত্যাশিত দাম পাচ্ছেন না কৃষকেরা। জমিতে একটি লাউ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২ থেকে ৩ টাকায়। অথচ স্থানীয় বাজারে একই লাউয়ের দাম ২০ থেকে ২৫ টাকা। রাজধানী ঢাকায় পৌঁছানোর পর সেই লাউ বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে হতাশ হয়ে পড়েছেন চাষিরা। অন্যদিকে, বেশি দামে সবজি কিনতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ ক্রেতারা।

জেলার বিভিন্ন এলাকায় এবার লাউয়ের প্রচুর ফলন হয়েছে। গাছে গাছে লাউ ঝুললেও ন্যায্য দাম না পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে হতাশা। বিশেষ করে আটোয়ারী উপজেলার চাষিরা পড়েছেন বেশি বিপাকে। শ্রমিকের মজুরি, সার, পরিচর্যা ও পরিবহন খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।

একজন কৃষক জানান, এক বিঘা জমিতে লাউ চাষ করতে তাঁর প্রায় ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। অথচ এখন পর্যন্ত বিক্রি করে আয় হয়েছে মাত্র ১৫ হাজার টাকা। এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন তিনি। একই জমিতে অন্য ফসল চাষ করলে তুলনামূলক ভালো আয় করা সম্ভব হতো বলেও মনে করছেন কয়েকজন চাষি।

কৃষকদের অভিযোগ, বাজারে লাউয়ের চাহিদা ও বিক্রির নিশ্চয়তা না থাকায় অনেক সময় উৎপাদিত সবজি জমিতেই নষ্ট করতে হচ্ছে। কম দামে বিক্রি করেও উৎপাদন খরচ ওঠানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে পরবর্তী মৌসুমে সবজি চাষ অব্যাহত রাখা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

মাঠ থেকে রাজধানী, দামের ব্যবধান কেন?

কৃষকের কাছ থেকে কম দামে লাউ সংগ্রহ করেন পাইকার ও বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা। পরে পরিবহন ও একাধিকবার হাতবদলের মধ্য দিয়ে তা স্থানীয় বাজার এবং রাজধানীর খুচরা দোকানে পৌঁছায়। প্রতিটি পর্যায়ে খরচ যুক্ত হওয়ায় কৃষকের বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে ভোক্তার ক্রয়মূল্যের বড় ব্যবধান তৈরি হচ্ছে।

তবে এই ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ক্রেতারা। তাদের বক্তব্য, কৃষক যেখানে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না, সেখানে ভোক্তাকে কেন কয়েক গুণ বেশি দাম দিতে হবে? সরবরাহব্যবস্থার কোন পর্যায়ে কত খরচ হচ্ছে এবং কারা কতটা মুনাফা করছেন, তা স্বচ্ছভাবে নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

অন্যদিকে, আড়তদার ও খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, পরিবহন, পণ্য ওঠানো-নামানো এবং বিভিন্ন পর্যায়ে হাতবদলের কারণে খরচ বাড়ে। এসব ব্যয় যুক্ত হওয়ার পরও ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশিত লাভ হচ্ছে না বলে দাবি তাদের।

উৎপাদন বেশি, দাম কম

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পঞ্চগড়ে প্রতিবছর গড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ হেক্টর জমিতে লাউ চাষ করা হয়। এবার একই সময়ে অনেক কৃষকের লাউ বাজারে আসায় সরবরাহ বেড়েছে। ফলে দাম কমে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল মতিনের মতে, কৃষকেরা সরাসরি বাজারে পণ্য বিক্রি করতে পারলে ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ বাড়বে। একই সময়ে অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে বর্তমানে দাম কম থাকলেও কয়েক দিনের মধ্যে সরবরাহ কমলে দাম বাড়তে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

এদিকে, জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মুয়ালেনা খানম জানিয়েছেন, জনবল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে কৃষকদের পর্যাপ্ত সহায়তা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। পরিস্থিতি উন্নয়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

সংকট সমাধানে প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ

কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে সংগ্রহকেন্দ্র স্থাপন, কৃষক সমবায়ের মাধ্যমে সরাসরি বিক্রি, পরিবহনব্যবস্থা উন্নত করা এবং কৃষক ও ক্রেতার মধ্যে সরাসরি সংযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

পাশাপাশি, সবজির সরবরাহ ও বাজারদর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং মধ্যবর্তী পর্যায়ের খরচ ও মুনাফায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও জরুরি। এতে একদিকে কৃষকের লোকসান কমানো সম্ভব হবে, অন্যদিকে ভোক্তার জন্যও পণ্যের দাম সহনীয় রাখা সহজ হবে।

লাউয়ের ভালো ফলন কৃষকের জন্য সম্ভাবনার কথা হলেও ন্যায্য বাজারমূল্যের অভাবে সেই সম্ভাবনা এখন আর্থিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। কৃষক ও ভোক্তা—উভয়ের স্বার্থ রক্ষায় উৎপাদন থেকে বিক্রি পর্যন্ত পুরো বিপণনব্যবস্থায় কার্যকর সংস্কার এখন সময়ের দাবি।